একুশ শতকে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প ও ফ্যাশন

সমস্যা ও সম্ভাবনা

Authors

  • তরুন কুমার সরকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

DOI:

https://doi.org/10.59185/jurpc.v36i2.380

Keywords:

তাঁতশিল্প, তাঁতি, তাঁতযন্ত্র, ফ্যাশনশিল্প, একুশ শতক, বিবর্তন, রংরেজ, বুটিক হাউস, ঐতিহ্য, জামদানি, মসলিন ও সম্ভাবনা

Abstract

বাংলাদেশের তাঁতশিল্প একদিকে হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক,

অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতির বৃহৎ অংশের জীবিকা। জামদানি, মসলিন, কাতান, খদ্দর,

গামছা-এসব শুধু কাপড় নয়, বাংলার বয়নকৌশল, আঞ্চলিক রুচি, সামাজিক ইতিহাস

আর মানুষের সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একুশ শতকে এসে এই শিল্প সবচেয়ে বড়

ধাক্কা খেয়েছে বাজার-প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের দাম, পাওয়ারলুমের আগ্রাসন আর

নীতি-সহায়তার অভাবে। হাতে বোনা কাপড়ের দাম যেমন বেশি, তেমনি বানাতে সময়ও

লাগে অনেক-ফলে তাঁতিরা ন্যায্য মূল্য না পেয়ে পেশা ছেড়ে দিচ্ছে, নতুন প্রজন্ম এই

ক্ষেত্রকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ভাবছে না। তাঁতশিল্পে এখনো পর্যন্ত-কারিগরদের জন্য বীমা

নেই, পেনশন নেই, উৎপাদনে প্রযুক্তি উন্নয়ন নেই, বাজারে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে যথাযথ

কার্যকর আইন নেই। ফলে তাঁতশিল্প টিকে আছে ঐতিহ্য, আবেগ আর কিছু সচেতন

গ্রাহকের উপর, শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার উপর নয়-এটাই আজকের বড় সংকট।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্প একই সময়ে একদম ভিন্ন দিকে বিকশিত

হয়েছে। নব্বই-এর দশক পর্যন্ত দেশে পোশাক ছিল ব্যবহারিক সামগ্রী, কিন্তু দুই হাজার

দশকের পর ফ্যাশন হয়ে ওঠে পরিচয়, নন্দন, সামাজিক মর্যাদা ও সৃজনশীল ব্যবসার

ক্ষেত্র। নতুন ডিজাইনার, ফ্যাশন হাউস, র‌্যাম্প শো, অনলাইন ব্র্যান্ড, ফটোগ্রাফি, স্টাইল

ব্লগিং-সব মিলিয়ে ফ্যাশন এখন সাংস্কৃতিক অর্থনীতির কার্যকর শাখা। শহুরে তরুণদের

মধ্যে ফিউশন ফ্যাশন জনপ্রিয় হয়েছে-যেখানে শাড়ি এসেছে কেপ স্টাইলে, পাঞ্জাবি

হয়েছে শর্ট কাটে, গামছা হয়েছে স্কার্ফে, তাঁতের কাপড়ে হয়েছে ব্লেজার, স্কার্ট, ব্যাগ,

জুতা পর্যন্ত। অর্থাৎ ফ্যাশনশিল্প ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণ করছে না, বরং রিডিজাইন করে

বাজারযোগ্য রূপ দিচ্ছে। এ দিক দিয়ে ফ্যাশন তাঁতশিল্পের জন্য আয়, পরিচিতি ও

ভবিষ্যতের নতুন দরজা খুলেছে-যেখানে কাপড় কেবল স্থানীয়ভাবে প্রথাগত উৎপাদন

নয়, বরং কনসেপ্ট, গল্প আর ব্র্যান্ড-আইডেন্টিটির অংশ।

তবে দুই শিল্পের জটিল বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁতশিল্পে সমস্যা উৎপাদন-সংকট, আর

ফ্যাশনশিল্পে সমস্যা কাঠামোগত। তাঁতিরা ন্যায্য দাম পায় না, ডিজাইনাররা নকল

ডিজাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁতশিল্পে শ্রম আছে, কিন্তু পরিকল্পিত বাজার নেই; ফ্যাশনশিল্পে

বাজার আছে, কিন্তু গবেষণা ও টেকসই নীতি নেই। বিদেশি ফাস্ট ফ্যাশন, সিনথেটিক

কাপড়, সস্তা আমদানি-এসবের কাছে বাংলার হাতে বোনা কাপড় দাম ও গতি-দুই দিকেই

পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে ফ্যাশনশিল্পেও চ্যালেঞ্জ কম নয়-উৎপাদনসংকট, কাঁচামালের

অভাব, পরিবেশদূষণ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, এবং আন্তর্জাতিক মান রপ্তানিতে কাঠামোগত

দুর্বলতা। বিশেষ করে নকল জামদানি, প্রিন্টেড মসলিন, ভারতীয় বেনারসি-এইসব নকল

 

ও পাওয়ারলুমের বাজারে আসল কারিগর, আসল ডিজাইন ও আসল ঐতিহ্য বিপন্ন হয়ে

পড়ে।

তবু সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো-এই দুই শিল্প একে অপরের পরিপূরক হয়ে

উঠছে। তাঁতশিল্প ঐতিহ্য দেয়, ফ্যাশনশিল্প তাকে আধুনিক ভাষা দেয়। তাঁতি দেয়

কাপড়, ডিজাইনার দেয় মূল্য। রাজশাহী সিল্ক, নরসিংদীর তাঁত, টাঙ্গাইলের শাড়ি,

সুনামগঞ্জের গামছা-এগুলো এখন শুধু স্থানীয় পণ্য নয়, বরং সম্ভাব্য ব্র্যান্ড-ভিত্তিক বৈশ্বিক

পণ্যে রূপ নিতে পারে। বিশ্ববাজারে আজ “হ্যান্ডমেড”, “এথনিক”, “সাস্টেইনেবল”,

“স্টোরিটেলিং ফ্যাশন”-এই চার ধরনের পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, আর ঠিক

এখানেই বাংলাদেশের তাঁত ও ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সবচেয়ে বড়। যদি রাষ্ট্রীয়

নীতি, উদ্যোক্তা-বান্ধব বিনিয়োগ, কারিগর সুরক্ষা, ডিজাইন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক

বিপণন-এই সবকিছু একসঙ্গে কার্যকর হয়, তবে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প টিকে থাকবে শুধু

ইতিহাসে নয়, বরং অর্থনীতিতেও; আর ফ্যাশনশিল্প পরিণত হবে “কপি-কালচার” নয়,

বরং “ নন্দন”-এর শক্তিশালী পরিচয়ে।

সর্বোপরি, একুশ শতকে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প ও ফ্যাশনশিল্প একই সঙ্গে ঐতিহ্য

রক্ষা ও আধুনিকতার অভিযাত্রায় আছে। এই যুগে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা

উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বাজার সম্প্রসারণ ও ন্যায্য উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বিত প্রয়াস।

সমস্যা অনেক, কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে তাঁতশিল্প ও ফ্যাশন মিলিতভাবেই

বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতির উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।]

 

 

 

 

Author Biography

তরুন কুমার সরকার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সহযোগী অধ্যাপক, চারুকলা বিভাগ

Downloads

Published

2025-12-31

How to Cite

সরকার ত. ক. (2025). একুশ শতকে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প ও ফ্যাশন : সমস্যা ও সম্ভাবনা. The Jahangirnagar Review Part-C, 36(2), 41–66. https://doi.org/10.59185/jurpc.v36i2.380

Issue

Section

Articles